মাক্কী Makki مَكِّيّ · ৬ আয়াত · ১১৪

আন-নাস

الناس

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ

قُلۡ أَعُوذُ بِرَبِّ ٱلنَّاسِ ١ مَلِكِ ٱلنَّاسِ ٢ إِلَٰهِ ٱلنَّاسِ ٣ مِن شَرِّ ٱلۡوَسۡوَاسِ ٱلۡخَنَّاسِ ٤ ٱلَّذِي يُوَسۡوِسُ فِي صُدُورِ ٱلنَّاسِ ٥ مِنَ ٱلۡجِنَّةِ وَٱلنَّاسِ ٦

সূরা আন-নাস এর শিক্ষা ও তাৎপর্য

পরম করুনাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি


আয়াতের অনুবাদ:

১. বল, আমি আশ্রয় প্রার্থনা করছি মানুষের প্রতিপালকের, ২. মানুষের অধিপতির, ৩. মানুষের উপাস্যের, ৪. আত্মগোপনকারী কুমন্ত্রণাদাতার অনিষ্ট হতে, ৫. যে কুমন্ত্রণা দেয় মানুষের অন্তরে, ৬. জীন ও মানুষের মধ্য হতে।

তাফসীর:

আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তায়ালা পবিত্র কুরআনের সর্বশেষ সূরা—'সূরা আন-নাস' শুরু করেছেন আশ্রয় প্রার্থনার (ইস্তিয়াযা) মাধ্যমে, যা এর আগের সূরা 'সূরা আল-ফালাক'-এর সূচনার অনুরূপ । আল্লাহ তায়ালা বলেন: قُلۡ أَعُوذُ بِرَبِّ ٱلنَّاسِ অর্থাৎ, আমি মানুষের রবের কাছে আশ্রয় চাই, তাঁর সাথে নিজেকে সুরক্ষিত করি এবং তাঁরই অভিমুখী হই। এরপর তিনি ‘রুবুবিয়াত’ বা প্রতিপালন গুণের সাথে তাঁর পরিপূর্ণ রাজত্ব বা ‘মালিকিয়াত’ যুক্ত করে বলেছেন: مَلِكِ ٱلنَّاسِ অর্থাৎ, যিনি মানুষের সকল বিষয়ের একমাত্র নিয়ন্ত্রণকারী। অতঃপর মানুষের ওপর তাঁর পূর্ণ রাজত্বের অধিকারের সাথে এই ঘোষণা দিয়েছেন যে, তিনিই তাদের একমাত্র মাবুদ (উপাস্য) এবং তিনি ব্যতীত তাদের আর কোনো ইলাহ নেই। আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লা বলেন: إِلَٰهِ ٱلنَّاسِ অর্থাৎ, মানুষের সেই একমাত্র মাবুদ, যাঁর কোনো শরিক নেই এবং তিনি ছাড়া আর কেউ উপাস্য হওয়ার যোগ্য নয়।

যদিও আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা সবকিছুরই পালনকর্তা, তথাপি এখানে তিনি বিশেষভাবে ‘মানুষের প্রতিপালক’ হিসেবে নিজেকে উল্লেখ করেছেন। এর উদ্দেশ্য হলো মানুষের প্রতি তাঁর বিশেষ যত্ন ও গুরুত্ব প্রকাশ করা এবং এটি মনে করিয়ে দেওয়া যে, সমগ্র মানবজাতিই এই কুরআনের সম্বোধনকারী। এজন্যই তিনি কিতাব নাযিল করেছেন এবং রাসূলগণকে পাঠিয়েছেন, যাঁদের সর্বশেষ হলেন আমাদের নবী মুহাম্মদ (সা.)।

মানুষকে ‘রুবুবিয়াত’ বা প্রতিপালন গুণের মাধ্যমে সম্বোধন করার উদ্দেশ্য হলো তাদের এটি জানানো এবং সতর্ক করা যে, তিনি ছাড়া তাদের আর কোনো পালনকর্তা নেই। তাই তাদের উচিত আল্লাহ ব্যতীত অন্য সকল সৃষ্ট সত্তার দাসত্ব ত্যাগ করা। কেননা প্রতিপালক হিসেবে আল্লাহর সামনে সকল মানুষ সমান; মানুষের মধ্যে এমন কেউ নেই যাকে আল্লাহর ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া যায়। এর মাধ্যমে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত বা পবিত্রতা বর্ণনা করার পথ বন্ধ করা হয়েছে ।

অতঃপর তিনি তাঁর রুবুবিয়াতকে আরও সুদৃঢ় করেছেন এই বলে যে, তিনিই তাদের একমাত্র মালিক। আল্লাহ বলেন: مَلِكِ ٱلنَّاسِ অর্থাৎ, তোমাদের রবই সকল মানুষের প্রকৃত অধিপতি। এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, মালিকের কাছে সকল মানুষ সমান এবং তারা সবাই তাঁর সৃষ্টি ও গোলাম।

সৃষ্টিজগতের সবকিছুই আল্লাহর মালিকানাধীন হওয়া সত্ত্বেও তিনি বিশেষভাবে মানুষের কথা উল্লেখ করেছেন যাতে মানুষ ইবাদত, ভয় কিংবা আশার ক্ষেত্রে অন্য কোনো সৃষ্টির দিকে ধাবিত না হয়। কেননা একজন প্রকৃত গোলাম বা মালিকানাধীন সত্তা কেবল তার মালিকের দিকেই মুখাপেক্ষী হয়, কেবল তাঁর আদেশ পালন করে এবং তাঁর নিষেধ মেনে চলে। সে কেবল মালিকের আনুগত্য করে এবং অবাধ্যতা থেকে বিরত থাকে।

রুবুবিয়াত ও মালিকিয়াতের বর্ণনার পর মানুষের উপর যা অনিবার্য হয় তা উল্লেখ করে আল্লাহ বলেন: إِلَٰهِ ٱلنَّاسِ অর্থাৎ, হে মানুষ! তিনিই তোমাদের একমাত্র মাবুদ। আল্লাহ এখানে উলুহিয়াতকে কেবল নিজের জন্যই নির্দিষ্ট করেছেন। এর দাবি হলো, যাবতীয় ইবাদত কেবল সেই রবের জন্যই নিবেদিত হবে যিনি প্রকৃত মালিক এবং যাঁর কোনো শরিক নেই। এর অর্থ এই যে, যে ব্যক্তি তার রব ও মালিকের প্রাপ্য অধিকার বা ইবাদত অন্য কারো জন্য ব্যয় করবে, সে কুফরী করল এবং তার প্রভুর প্রতি পালনীয় দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত হলো।

অতঃপর আল্লাহ তাঁর বান্দাদের পথ দেখিয়েছেন যে, এই আশ্রয় প্রার্থনা মূলত সেই অনিষ্ট থেকে বাঁচার জন্য যা শয়তানি কুমন্ত্রণা বা অশুভ চিন্তার মাধ্যমে সৃষ্টি হয় । আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তায়ালা বলেন: مِن شَرِّ ٱلۡوَسۡوَاسِ ٱلۡخَنَّاسِ অর্থাৎ, হে রাসূল (সা.)! আপনি এবং আপনার অনুসারী উম্মত সেই ‘ওয়াসওয়াসা’ প্রদানকারী শয়তানের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করুন, যে কখনো আত্মগোপন করে আর কখনো কুমন্ত্রণা দেয়। ٱلۡخَنَّاسِ অর্থ হলো আত্মগোপন করে পিছিয়ে যাওয়া। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত: “প্রতিটি নবজাতকের হৃদয়ের ওপর শয়তান জেঁকে বসে থাকে; যখন সে সচেতন হয় এবং আল্লাহর যিকির করে তখন শয়তান পালিয়ে যায় (খান্নাস), আর যখন সে গাফেল বা উদাসীন হয় তখন শয়তান কুমন্ত্রণা দেয়”।[1] আল্লাহ তায়ালা শয়তানের এই কাজকে ‘অনিষ্ট’ বা شَرِّ বলেছেন। কারণ, সে কেবল মানুষকে পাপের দিকে ঠেলে দিতে বা ভীতি ও উদ্বেগের মধ্যে ফেলতেই কুমন্ত্রণা দেয়। সে কখনোই কল্যাণের পথ দেখায় না।

একারণেই শয়তানের হাত থেকে বাঁচতে অধিক পরিমাণে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করা এবং আল্লাহর যিকির করা আবশ্যক, যার ফলে সে পালিয়ে যায় । একইভাবে এই বরকতময় সূরাটি পাঠের মাধ্যমেও তার অনিষ্ট থেকে আশ্রয় লাভ করা যায় ।

অতঃপর আল্লাহ তায়ালা মানুষের শরীরে শয়তানের কুমন্ত্রণা দেওয়ার সুনির্দিষ্ট স্থানটি চিহ্নিত করে দিয়েছেন। আল্লাহ জাল্লা জালালুহু বলেন: ٱلَّذِي يُوَسۡوِسُ فِي صُدُورِ ٱلنَّاسِ অর্থাৎ, শয়তানের যাবতীয় অশুভ প্ররোচনা মানুষের বুকের ভেতর বা অন্তরে সংঘটিত হয়। কুরআনের এই বর্ণনায় কোনো ব্যতিক্রম ছাড়াই সকল মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণার ব্যাপকতাকে তুলে ধরা হয়েছে। বক্ষ বা অন্তরই হলো সেই স্থান যেখানে ٱلۡخَنَّاسِ বা আত্মগোপনকারী শয়তান মানুষকে প্রলুব্ধ করে। এর অর্থ হলো, হে মানুষ! তোমাদের অন্তরে শয়তান যে কুমন্ত্রণা দেয় সে সম্পর্কে তোমাদের সতর্ক থাকতে হবে এবং কখনোই তার ডাকে সাড়া দেওয়া যাবে না। এর থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হলো আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ করা এবং অধিক পরিমাণে তাঁর যিকির করা; কারণ যিকির করলে সে পিছু হটে এবং আত্মগোপন করে।

এরপর আল্লাহ তায়ালা সেই উৎস সম্পর্কে জানাচ্ছেন যেখান থেকে এই কুমন্ত্রণা আসে। আল্লাহ তায়ালা বলেন: مِنَ ٱلۡجِنَّةِ وَٱلنَّاسِ অর্থাৎ, এই অনিষ্টকর কুমন্ত্রণার উৎস হলো ‘জ্বিন’, যারা মানুষের চোখের আড়ালে এক অদৃশ্য জগত। আবার মানুষের মধ্যেও এমন অনেকে আছে যারা একে অপরকে অশুভ কুমন্ত্রণা দেয়। আল্লাহ এখানে জ্বিনের সাথে মানুষকেও যুক্ত করেছেন, কারণ মানুষও অনেক সময় সুন্দর ও চাকচিক্যময় কথার মাধ্যমে বিভ্রান্তি, সংশয় এবং অনিষ্টকর চিন্তা অন্যের হৃদয়ে ঢুকিয়ে দেয়। এটি মানুষকে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে প্ররোচিত করে এবং উদ্বেগের সৃষ্টি করে।

ইবনুল জাওযী ইমাম যাজ্জাজ (রহ.)-এর উক্তি উল্লেখ[1] করেছেন যে, ‘জ্বিন ও মানুষ’ বলার অর্থ হলো জ্বিন এবং মানুষ—উভয় প্রকার শয়তানের অনিষ্ট থেকেই আশ্রয় প্রার্থনা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ইমাম সাদী (রহ.) বলেছেন: “জ্বিন যেমন মানুষের মনে কুমন্ত্রণা দেয়, তেমনি মানুষও কুমন্ত্রণা দিয়ে থাকে”।[2] অর্থাৎ মানুষের দেওয়া কু-পরামর্শের প্রভাব জ্বিনের কুমন্ত্রণার মতোই ক্ষতিকর। পার্থক্য হলো, জ্বিন সরাসরি মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেয়, আর কুমন্ত্রণাদাতা মানুষ তার সুশোভিত কথার মাধ্যমে কান দিয়ে হৃদয়ে সেই বিষ প্রবেশ করায়। তাই এই উভয় প্রকার কুমন্ত্রণাদাতার অনিষ্ট থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া অপরিহার্য।

এটি আল্লাহর বান্দাদের প্রতি তাঁর বিশেষ রহমত যে, তিনি এই ক্ষতিকর কুমন্ত্রণা থেকে বাঁচার কার্যকর উপায় ও মাধ্যম শিখিয়ে দিয়েছেন এবং ক্ষতির স্থানটিও স্পষ্ট করে দিয়েছেন। এই ক্ষতিটি ঘটে মানুষের অন্তরে, আর ‘মুআউবিজাত’ (আশ্রয় প্রার্থনার সূরাসমূহ) হলো এর জন্য সুরক্ষা ও নিরাময়। আমরা এই নেয়ামতের জন্য আল্লাহর প্রশংসা করি এবং কৃতজ্ঞতা জানাই মহান কুরআনের জন্য, যা শান্তির পথ দেখায় এবং দুনিয়ার যাবতীয় অনিষ্ট ও আখেরাতের আযাব থেকে মুক্তির একমাত্র উপায়।

হে আল্লাহ! কুরআনকে আমাদের হৃদয়ের বসন্ত, বক্ষের নূর, দুঃখ-কষ্টের অপনোদনকারী এবং দুশ্চিন্তা দূরকারী বানিয়ে দিন। আমাদের কুরআনের অনুসারী হিসেবে কবুল করুন এবং আমাদের শেষ পরিণাম সুন্দর করুন। হে আরহামুর রাহিমীন! আপনার অনুগ্রহ ও রহমতে আমাদের দুআ কবুল করুন।

আমি মহান আল্লাহর প্রশংসা ও শুকরিয়া আদায় করছি যে, তিনি আমাকে এই মহৎ কাজ করার তাওফিক দিয়েছেন এবং সূরা আন-নাস এর কাজ সম্পন্ন করার সুযোগ দান করেছেন। হে আমাদের রব! আমাদের পক্ষ থেকে এটি কবুল করুন, নিশ্চয়ই আপনি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞাতা। আমাদের তওবা কবুল করুন, নিশ্চয়ই আপনি তওবা কবুলকারী ও পরম দয়ালু। সমস্ত প্রশংসা জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য এবং সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের নবী মুহাম্মদ (সা.) এবং তাঁর পরিবার-পরিজনের ওপর।


ফুটনোট:

[1] আত-ত্ববারী, আল-জামিউলবায়ান আনতা’বিল আয়্যিল কুরআন ২৪/৭৫৪।

[1] ইবনুল জাওযী, যাদুল মাসির ফী ইলমিত তাফসীর ৮/৩১৪

[2] আস-সা’দী, তাইসীরুল কারিম আর-রাহমান ফী তাফসীরি কালামিল মান্নান ৫/৪৭৫